ওজনভেদে একেকটি গয়ালের বিক্রয় মূল্য ২ লাখ টাকা পর্যন্ত

গয়াল বন্যগরুর একটি প্রজাতি কি না, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এরা কোনো বিলুপ্ত প্রজাতির বন্যগরুর পোষা বংশধর বা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের পোষা গরু ও গৌরের সংমিশ্রণে সৃষ্ট সংকর গরু। যারা প্রজাতি হিসেবে গণ্য করেন, তাঁরা গয়ালের বৈজ্ঞানিক নাম Bos frontalis বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে গৃহপালিত গরু, বুনো মহিষ ও বিশেষত গৌরের সাথে গয়ালের লক্ষণীয় তফাৎ রয়েছে। গৌরের দুই শিঙের মধ্যে ঢিবির মতো আছে, যা গয়ালের নেই। গৌরের শিং অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ওপরের দিকে ভেতরমুখী বাঁকানো। গয়ালের শিং দুই পাশে ছড়ানো, সামান্য ভেতরমুখী বাঁকানো। শিঙের গোড়া অত্যন্ত মোটা। গয়াল পোষ মানলেও গৌর পোষ মানে না।

ফেনী জেলার মহিপাল থেকে শামসুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী সাতকানিয়া উপজেলার কেঁউচিয়া বাইতুল ইজ্জত এসেছেন মেজবানির জন্য গয়াল কিনতে। ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় কিনেছেনও একটি। গত বছরও তিনি আরেকটি অনুষ্ঠানের জন্য ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় একটি গয়াল কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু অনুষ্ঠানের জন্য নয়, ব্যবসার জন্যও তিনি গয়াল কেনেন।

শামসুল ইসলাম বলেন, গরু-মহিষের চেয়ে গয়ালে মাংস পাওয়া যায় অনেক বেশি, স্বাদও চমৎকার। তাছাড়া গয়াল ভিন্নধর্মী প্রাণী, এটি এলাকায় নিয়ে গেলে দেখতে লোকজনের ভিড় জমে যায়। তাই বিক্রিও হয় ভালো দামে। তিনি সাতকানিয়া থেকে নিয়মিত গয়াল কিনে ফেনী নিয়ে যান। শামসুল ইসলাম শুধু নয়, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, নোয়াখালীর চৌমুহনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে গয়াল কিনতে আসা আরও অনেকে একই কথা বললেন।

চট্টগ্রামে গরু-মহিষের মাংসের দাম বেশি হওয়ায় গয়ালের মাংসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ বাণিজ্যিকভাবে গয়াল পালনে ঝুঁকছে। মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য পাহাড়ি গয়ালের ব্যবহার সাফারি পার্কে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিয়াজুল হক জসীম বলেন, দেশে এখন গরু-মহিষের দাম বেড়ে গেছে, পশুর দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই সময়ে মাংসের চাহিদা পূরণে গয়ালের ব্যবহার একটি ভালো লক্ষণ।

তিনি বলেন, গয়ালের ব্যবহার জনপ্রিয় হলে দেশি-বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরতা যেমন কমে আসবে, তেমনি গয়ালের বাণিজ্যিক লালনপালনে মানুষ আকৃষ্ট হবে। গয়ালের মাংসে কোলেস্টেরল কম হওয়ায় এটি মানবদেহের জন্য সবসময় কম ঝুঁকিপূর্ণ। গয়াল শুধু দুর্বল খাবারেই লালনপালন করা হয়ে থাকে এবং এদের দেহে কোনো ধরনের কৃত্রিম ওষুধ প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না।

গয়ালের মাংস সবার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বলেও জানান প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। গয়াল ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় শুধু সাতকানিয়ার কেঁউচিয়ায় নয়, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও পটিয়ার আরও কয়েকটি স্থানে গয়াল বিক্রি হয়ে থাকে। তবে পটিয়ার চক্রশালা ও সাতকানিয়ার কেঁউচিয়ায় সারা বছরই গয়ালের কেনাবেচা চলে। শীত মৌসুম এলে বিভিন্ন স্থানে ওরস, মিলাদ মাহফিল, মেজবান উপলক্ষে গয়ালের বেচাকেনা বাড়ে।

গৃহস্থ ও ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় গয়াল ছিল বণ্যপ্রাণী তালিকাভুক্ত। অবৈধ শিকারিরা পাহাড়ে ফাঁদ পেতে গয়াল ধরে সেগুলো গোপনে জবাই করে মাংস বিক্রি করত। পরে বনবিভাগ গয়ালকে গবাদি বা গৃহপালিত পশু হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকেই অনেক উপজাতি বাড়িতে গয়াল লালনপালন শুরু করে।

বর্তমানে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, থানছি, আলীকদম, বলিপাড়াসহ দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে এ পাহাড়ি পশুর লালনপালন করা হচ্ছে। উপজাতিদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা গয়াল কিনে সেগুলো সমতলের গ্রামে নিয়ে আসেন।

চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য জেলা থেকে লোকজন এসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গয়াল কিনে নিয়ে যান। সাতকানিয়ার কেঁউচিয়া বাইতুল ইজ্জত, আমতল, বন গবেষণাকেন্দ্র ও সত্যপীর মাজারপাড়া এলাকায় বিক্রির জন্য গয়াল রাখেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও হাতেগোনা কয়েকজন লোক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য গয়াল কিনতে আসত। এখন সে সংখ্যা কয়েকশ পেরিয়ে গেছে। গয়ালে গরু-মহিষের তুলনায় বেশি মাংস পাওয়া যাওয়ায় এটির ব্যবহার বেড়ে চলেছে সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে। সাম্প্রতিক সময়ে মাংসের প্রয়োজন হয় এমন অনুষ্ঠানগুলোতে গয়ালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গয়াল পালন লাভজনক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গয়াল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত জনার কেঁউচিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ইদ্রিচ ও বাজালিয়ার নুর মোহাম্মদ বলেন, গয়াল দিয়ে মেজবান দিতে আগ্রহীদের মধ্যে বিত্তশালী লোকজনই বেশি উৎসাহী।

তিনি জানান, একটা সময় ছিল বান্দরবানের বিভিম্ন এলাকার বনজঙ্গলে প্রচুর গয়াল পাওয়া যেত। তখন এগুলো বন্যগ্রাণী হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন বান্দরবানের বিভিম্ন উপজেলায় উপজাতি পরিবারগুলো বাণিজ্যিকভিত্তিতে গয়াল পালন করে আসছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারে ২০-৩০টি গয়াল পালন করা হয়।

বর্তমানে সহস্রাধিক উপজাতি পরিবার সারা বছরই গয়াল পালন করে থাকে। কোনো কোনো স্থানে ইতোমধ্যে গয়ালের বাণিজ্যিক খামারও গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানান ইদ্রিচ। এসব পরিবার ও খামার থেকে ব্যবসায়ীরা গয়াল কিনে লোকালয়ে নিয়ে আসেন।

গয়াল ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, বাজারে বিক্রি হওয়া গরু-মহিষের তুলনায় গয়ালের দাম একটু বেশি হয়। কারণ গয়াল সবসময় মোটাতাজা হওয়ায় এ পশুতে মাংস বেশি পাওয়া যায়। একেকটি গয়াল ওজন ভেদে এক থেকে দেড়-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। লোকজনের চাহিদা মোতাবেক দেশের বিভিন্ন এলাকায় গয়াল পাঠিয়ে থাকেন বলেও জানান গয়াল বেপারি নুর মোহাম্মদ

এরশাদ মাহমুদ তার কৃষি আর প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসা থেকে বেশ ভালোভাবেই বুঝেছিলেন এই প্রাণীর সম্ভাবনা। এরশাদ মাহমুদ তার অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, গয়াল নানা বিবেচনায় আমাদের জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। দেশের বিভিন্ন গরুর গড় ওজন ২০০-৪০০ কেজি। কিন্তু প্রতিটি গয়ালের গড় ওজন ৫০০-৮০০ কেজি। ভালোমানের কম চর্বিযুক্ত মাংসের কারণে দেশীয় গরুর চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের প্রতিটি গয়াল সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে বিক্রি হওয়া গরু-মহিষের তুলনায় গয়ালের দাম একটু বেশি।

একেকটি গয়াল ওজনভেদে ৮০ হাজার থেকে দেড়-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গরু-মহিষের চেয়ে বেশি মাংস পাওয়া যাওয়ায় গয়ালের চাহিদা বাড়ছে। গয়াল লালন-পালনে খরচ তুলনামূলক কম। গহিন বনের যেখানে ছোট ছোট ঝোপের কচিপাতা ও ডালপালা আছে তেমন জায়গা গয়ালের বেশ পছন্দ। সাধারণত ১০-১১ মাস গর্ভধারণের পর মাদি গয়াল একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। গাভীর মতো এদের ওলান নেই, স্তনবৃন্ত ছোট হওয়ায় এদের থেকে কখনো দুধ দোয়ানো যায় না। তাই গয়াল মূলত মাংসের চাহিদা পূরণ করে। গয়ালের মাংসে কলেস্টেরল কম হওয়ায় এটি মানবদেহের জন্য সবসময় কম ঝুঁকিপূর্ণ।

তৃণভোজী গয়ালের খাবারও মোটা দাগে গরুর মতোই। মজার ব্যাপার, এরশাদ মাহমুদ নিজে খামার গড়লেও গয়ালকে পাহাড়ি বনভূমির বুক থেকে পুরোপুরি ছিনিয়ে আনেননি, বরং খামারের গয়ালকে পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন; গয়াল যাতে প্রাকৃতিকভাবেই তার রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে তিনি বলছেন, প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ে চরে বেড়ানো গয়াল এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় না।

গয়াল উচ্চতায় হয় ২-৩ মিটার। গায়ের রং কালো কিংবা সাদা। অপ্রাপ্তবয়স্ক গয়ালের রং সামান্য বাদামি। পূর্ণবয়স্ক ও মাদি গয়ালের রং কালোটির ক্ষেত্রে সামান্য লালচে হয়ে থাকে, আর সাদার ক্ষেত্রে কিছুটা সাদাটে বাদামি বা হলুদাভ হয়। এদের হাঁটুর নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সাদা লোমে আবৃত। মনে হয় সাদা মোজা পরানো। গয়ালের মাথার ওপরের কিছু অংশ এবং কপালেও রয়েছে সাদা লোম।

কপালের দুই পাশে ২টি বিশাল শিং। গরুর কাঁধের উঁচু মাংসপি- কুঁজ গয়ালের ক্ষেত্রে কাঁধ থেকে পিঠের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বুনো গয়াল দলবদ্ধভাবে বাস করে। দলের নেতৃত্বে থাকে ১টি বড় ও শক্তিশালী ষাঁড়। সাধারণত গয়াল বাঁচে ১৫-১৬ বছর। এরশাদ মাহমুদ জানালেন, গয়ালের বর্ধনহার গরুর চেয়ে বেশি। সে হিসাবে বাণিজ্যিকভাবে এটি অনেক বেশি লাভজনক। এ খামারে এরশাদ মাহমুদ ইতিমধ্যে দেশি গরু ও গয়ালের সংকরায়ণ করেছেন। এ গয়াল পরিবারে এরশাদ মাহমুদের বেশ মজার সময় কাটে। গয়ালের রকমসকম মিলিয়ে তিনি নানান নামও দিয়েছেন।

তথ্যসূত্রঃ ফারমস অ্যান্ড ফারমারস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *